মিষ্টি কি আসলেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?
মিষ্টি কি আসলেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?
নূর আহমদ
আমরা অনেকেই মিষ্টি চিনি এসব শর্করা জাতীয় খাবারকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মনে করি| এগুলো থেকে সব সময় দূরে থাকার চেষ্টা করি| এগুলো থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে ফিট থাকার চেষ্টা করি| মনে করি, এগুলো থেকে দূরে থাকলে ডায়াবেটিস হবে না, হৃদরোগ হবে না, ওজন বাড়বে না, শরীরে চর্বি জমবে না| আমাদের এই বিশ্বাস কি সঠিক? এই বিশ্বাস কি বাস্তবসম্মত?
এই বিষয়ে বিবিসি বাংলায় ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে একটি গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘মিষ্টি কি আসলেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?’ শিরোনামে| নিবন্ধটিতে আমাদের এই বিশ্বাস নিয়ে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত যুক্তি উল্লেখ করা হয়|
সেখানে প্রথমেই বলা হয়, ‘চিনি, শর্করা, সুগার - যে নামেই ডাকুন, গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানী আর ডাক্তারদের ক্রমাগত সতর্কবার্তার ফলে এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে জনস্বাস্থ্যের এক নম্বর শত্রু|
সরকার এর ওপর কর বসাচ্ছে| স্কুল আর হাসপাতালগুলো খাদ্যতালিকা থেকে একে বাদ দিয়ে দিচ্ছে| বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের খাবার থেকে চিনি সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে দিতে|
আমরা সবসময়ই শুনছি, যারা বেশি মিষ্টি খায় তাদের টাইপ-টু ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি|’
এরপরই বলা হয়, ‘কিন্তু এর বিপরীতেও একটা কথা আছে| আসলে এসব স্বাস্থ্যসমস্যার জন্য শর্করাই যে দায়ী, তা হয়তো না-ও হতে পারে|
ঠিক কিভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এই শর্করা, তা বের করতে গিয়ে কিন্তু বিজ্ঞানীরা দেখছেন, এটা প্রমাণ করা খুব কঠিন| বিশেষ করে, যখন তা উচ্চমাত্রার ক্যালরি সমৃদ্ধ খাদ্যের সাথে খাওয়া না হচ্ছে|’
এখানে বলা হয়েছে, আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর শর্করা কিভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তা প্রমাণ করা খুব কঠিন|
এরপর বলা হয়, ‘গত পাঁচ বছরে একাধিক গবেষণার ফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোন এক দিনের খাবারে যদি ১৫০ গ্রামের বেশি ফ্রুকটোজ থাকে, তাহলে তা উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়|
কিন্তু গবেষকরা আরো বলেছেন যে, এটা তখনই ঘটে, যখন আপনি উচ্চ ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের সাথে উচ্চমাত্রায় শর্করাসমৃদ্ধ খাবার খাচ্ছেন| তারা আরো বলছেন, শুধু সুগারের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি ˆতরি হয়, এটা বলা যায় না|’
এখানেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘শুধু সুগারের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, এটা বলা যায় না|’
এরপরের বক্তব্যটা বেশ ইন্টারেস্টিং| বলা হয়েছে, ‘তা ছাড়া, বিজ্ঞানীরা আরো বলছেন যে, কোন একটি খাবারকে সমস্যার মূল কারণ বলে চিহ্নিত করারও অনেক বিপদ আছে| কারণ, এর ফলে এমন হতে পারে, মানব দেহের জন্য প্রয়োজনীয় কোন খাবার হয়তো আপনি খাওয়া বন্ধ করে দিলেন|’
ভেবে দেখুন, আমরা চিনিকে ক্ষতিকর বা বিষ বলে তা বর্জন করে ভাবছি, বিষ থেকে বাঁচলাম| অথচ আমাদের অজান্তে হয়তো আমরা একটি প্রয়োজনীয় খাবারই খাদ্যতালিকা বাদ দিয়ে দিলাম!
বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত গবেষণামূলক নিবন্ধটিতে আরো বলা হয়, ‘কিন্তু সুগারের কারণেই যে হৃদরোগ বা ডায়াবেটিস হয়, এটা স্পষ্ট করে বলার উপায় এখনো নেই| লুজান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লুক টাপি বলছেন, অতিরিক্ত ক্যালরিই ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং উচ্চ রক্তচাপের কারণ এবং সুগার সেই উচ্চ ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের একটা অংশ মাত্র|’
এই বক্তব্যে বলা হয়েছে, সুগারের কারণেই যে হৃদরোগ বা ডায়াবেটিস হয়, এটা স্পষ্ট করে বলার উপায় নেই! তবু আমরা সুগারকেই হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এই সব রোগের জন্য দায়ী করছি!
এই বক্তব্যটি আমাদেরকে অবশ্যই ভাবতে বাধ্য করবে, কেন আমরা এককভাবে শুধু সুগারকেই হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী করছি? সুগার শুধু উচ্চ ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের একটা অংশ| শুধু সুগারেই কি ক্যালরি বৃদ্ধি পায়? শরীরে ক্যালরি বৃদ্ধি পাবার জন্য আর কিছুই কি দায়ী নয়?
এরপর দেখুন কী বলা হয়েছে| বলা হয়েছে, ‘এমন দেখা গেছে, যারা এ্যাথলেট বা ক্রীড়াবিদ, তারা বেশি শর্করা খেলেও শারীরিক পরিশ্রম বেশি করছেন বলে তা হজম হয়ে যাচ্ছে, কোন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে না|’
চিনি বা মিষ্টির প্রতি আমাদের ভয়কে অমূলক প্রমাণ করার জন্য এই একটি বক্তব্যই যথেষ্ট| এই বক্তব্য আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, চিনি, মিষ্টি এই সব শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া ক্ষতিকর নয়, বরং শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে থাকা বা আরামে আরামে জীবন কাটানোই মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকর| চিনি বা মিষ্টি বেশি বেশি খেলেও মানুষ যদি নিয়মিত যথেষ্ট পরিমাণে শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করে, তাহলে মানুষের শরীরে চর্বি জমা হতে পারে না, মানুষ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ এই সব রোগে আক্রান্ত হয় না| শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করলে মানুষ চিনি/মিষ্টি খাওয়া পুরোপুরি বর্জন করলেও মানুষের শরীরে সুগার বাড়বেই, মানুষ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার এই সব রোগে আক্রান্ত হবেই|
বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত নিবন্ধটির আরো একটি অংশ উল্লেখ করা প্রয়োজন| বলা হয়েছে, ‘আসলে খাদ্যতালিকা থেকে চিনিকে বাদ দিয়ে দেয়াটা বরং হিতে বিপরীত হতে পারে| এমন হতে পারে, চিনি বাদ দিয়ে আপনি হয়তো অতিরিক্ত ক্যালরিসমৃদ্ধ কোন খাদ্য বেশি খেতে শুরু করলেন, তাতে ক্ষতিই বেশি|’
আমরা সবাই জানি, চিনি একটি শর্করা জাতীয় খাবার| শরীরের ¯^াভাবিক কার্যক্রম ও বেঁচে থাকার জন্য শর্করা (পধৎনড়যুফৎধঃব) অপরিহার্য| শর্করা মানবদেহের প্রধান শক্তির উৎস, যা খাবার থেকে গ্রহণ করার পর গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে শরীরের কোষে শক্তি সরবরাহ করে| দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা, হাঁটাচলা কিংবা শারীরিক পরিশ্রমের জন্য শরীরের যে শক্তি প্রয়োজন হয়, তার বড় অংশ আসে শর্করা থেকে|
শর্করা শুধু শরীরের শক্তি জোগায় না, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে| কারণ মস্তিষ্কের কাজ করার জন্যও শর্করা গুরুত্বপূর্ণ| পর্যাপ্ত শর্করা না পেলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, মনোযোগ কমে যাওয়া, দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া এবং কাজের প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে| বিশেষ করে শিক্ষার্থী, পরিশ্রমী শ্রমজীবী মানুষ এবং নিয়মিত ব্যায়ামকারীদের জন্য পর্যাপ্ত শর্করা আরও বেশি প্রয়োজন|
পরিশেষে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত নিবন্ধটির মাধ্যমে একটি প্রশ্নের উত্তর জেনে নেয়া যাক| বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত নিবন্ধটিতে শেষে বলা হয়েছে, ‘তাহলে আমরা চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার মানেই তা খারাপ, ব্যাপারটা এরকম নেতিবাচক ভাবে চিত্রিত করি কেন?
জেমস ম্যাযিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ্যালান লেভিনোভিৎজ বলছেন, এর একটা কারণ হলো, আমরা যে জিনিসটার আকর্ষণ ঠেকাতে পারি না, সেটাকেই অশুভ হিসেবে চিত্রিত করি|
মিষ্টি খাবার তাড়না নিয়ন্ত্রণ করতেও আমরা একই জিনিস করছি|’
বেশ ইন্টারেস্টিং উত্তর|
হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ এই সব রোগ থেকে যারা নিরাপদ থাকতে চান, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, শরীরে চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তারা চিনি/মিষ্টি বর্জন করার কথা একপাশে রেখে, আগে শারীরিক পরিশ্রম করার অভ্যাস করুন বা ডায়েট কন্ট্রোলের অভ্যাস করুন| চিনি/মিষ্টি খেতে আপনার মন না চাইলে বাদ দিন বা বাড়তি সতর্কতা হিসেবে এসব খাবার বাদ দিন| কিন্তু শারীরিক পরিশ্রম বা ডায়েট কন্ট্রোল না করে শুধু এসব খাবার বাদ দেয়া মাধ্যমে ফিট থাকার আশা করে লাভ হবে না, বরং ক্ষতিই হতে পারে|
নূর আহমদ
ফিটনেস বিষয়ক লেখক।