ব্যাংকে/প্রভিডেন্ট ফান্ডে রাখা টাকা থেকে অর্জিত লাভ কি সুদ হবে??

ব্যাংকে/প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমাকৃত টাকা থেকে অর্জিত লাভ কি সুদ হবে?

নূর আহমদ

ভূমিকা:

সুদ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, (১) ‘‘আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’’ (২) “হে ঈমানদারগণ চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খাওয়া বন্ধ কর”। আরো অনেক আয়াতে সুদের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। কিন্তু সুদের সংজ্ঞা নিয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি। এটা হচ্ছে প্রথম কথা।

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ইসলাম মানুষের ব্যবহারিক জীবনে বিভিন্ন কাজে প্রতারণার সুযোগ রাখেনি। ইসলামে ধোঁকা-প্রতারণার সুযোগ নেই। নানাভাবে মানুষ প্রতারণার শিকার হয়। কথাবার্তা, কাজেকর্মে, লেনদেন, ব্যবস্যা-বাণিজ্যে ভেজাল মেশানো, পণ্যদ্রব্যের দোষ গোপন করা, মানুষকে ঠকানো, লটারি, খাদ্যজাত দ্রব্যে ফরমালিন মেশানো, জাল টাকা চালানো, ওজনে কম দেওয়া, উত্তমের সঙ্গে অনুত্তম পণ্য সরবরাহ করা, মিথ্যা শপথ করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, হাসপাতালের দায়িত্ব ছেড়ে প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা, স্কুল ফাঁকি দিয়ে কোচিং-বাণিজ্য করা ইত্যাদি। এক কথায়, যে কোনোভাবে মানুষ বা প্রাণীকে ঠকানোই প্রতারণা-ধোঁকা। কুরআনে বলা হচ্ছে, ‘তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারদের সঙ্গে প্রতারণা করে। অথচ এতে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে প্রতারিত করে না। কিন্তু তারা তা অনুভব করে না।’ (সুরা বাকারা : ৯)।

আমরা সবাই জানি, পুকুরের মাছ পুকুরে রেখে বিক্রি করা ইসলামে বৈধ নয়। কারণ এতে ক্রেতা প্রতারিত হতে পারে। বিক্রেতা বলবে, পুকুরে এতোগুলো মাছ আছে, কিন্তু বাস্তবে নাও থাকতে পারে। ধানের স্তুপ ভেতরে ঘেঁটে না দেখে কেনা বৈধ নয়, কারণ ভেতরে নিম্নমানের ধান বা খারাপ ধান থাকতে পারে, বিক্রেতা যতোই বুলক, ভেতরেও সব ধান ভালো, তবু ঘেঁটে দেখে কিনতে হবে। আরো সুস্পষ্টভাবে বললে, বস্তুর গুণাগুণ গোপন করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কোনো বস্তু বিক্রয় করা ইসলামে বৈধ নয়।

ইসলাম এক দিকে প্রতারণা করতে নিষেধ করেছে, অন্যদিকে যেসব লেনদেনে প্রতারণার সুযোগ আছে, সেসব লেনদেনের অনুমোদন দেয়নি।



এবার আসি সুদের প্রচলিত সংজ্ঞা প্রসঙ্গে।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধের শর্তে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য বা অর্থের বিপরীতে পূর্ব নির্ধারিত হারে যে বেশি পরিমাণ পণ্য বা অর্থ আদায় করা হয়, তাকেই বলে সুদ।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি কাউকে ১০০ টাকা ঋণ দেয় এ শর্তে যে, তাকে মেয়াদ শেষে ১১০ টাকা দিতে হবে। এখানে অতিরিক্ত ১০ টাকাকে সুদ বলা হবে।

এখানে যেই লোক টাকাটা নিয়েছে, সে কোন্ কাজের জন্য নিয়েছে, তা কিন্তু কোনোভাবে বিবেচনায় নেয়া হয় না।

ঋণ নেয়ার দুইটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। (১) ‘‘অলাভজনক’’ কাজে ব্যয়ের জন্য ঋণ নেয়া, যেমন: নিজে থাকার জন্য বসতঘর বা নিজে ব্যবহারের জন্য টয়লেট নির্মাণের প্রয়োজনে ঋণ। অথবা চিকিৎসার প্রয়োজনে ঋণ। (২) ‘‘লাভজনক’’ কাজে বিনিয়োগের জন্য ঋণ, যেমন: ব্যবসা করা জন্য বা বিক্রয়-ভাড়া দেয়ার উদ্দেশ্যে ভবন নির্মাণের জন্য ঋণ।

সুদের প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, উভয় খাতে খরচের জন্য দেয়া ঋণের উপর বাড়তি টাকা গ্রহণ-ই সুদ।

‘‘অলাভজনক’’ কাজে খরচের জন্য কাউকে ঋণ দিয়ে তা থেকে বাড়তি টাকা নেয়াটা অবশ্যই অনুচিত, অন্যায়। কারণ ঋণগ্রহীতার তো ওই খাত থেকে কোনো লাভ আসবে না। এটাই মূলত সুদ হওয়া উচিত ছিল। তাছাড়া চক্রবৃদ্ধি সুদের কথাও কুরআনে বলা হয়েছে। ‘‘অলাভজনক’’ খাতে ঋণ দিয়ে তা থেকে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ নেয়াটাও কোনোভাবে উচিত নয়।

কিন্তু ‘‘লাভজনক’’ খাতে ঋণ দিয়ে ওই ঋণের ওপর বাড়তি টাকা গ্রহণ করাটা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত। কারণ ঋণগ্রহীতা ওই টাকা দিয়ে ব্যবসা করে নিজেও লাভবান হয়। ওই লাভের টাকার একটা অংশ ঋণদাতাকে দিলে তারও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। উভয়ে লাভবান। উভয়ে সন্তুষ্ট।

একজন লোক বেকার। তার কোনো ইনকাম সোর্স নেই। আরেকজন লোকের নিকট ঋণ দেয়ার মতো টাকা আছে। এক্ষেত্রে বেকার লোকটি যদি টাকাঅলা লোকটি থেকে টাকা নিয়ে কোনো আয়মূলক কাজে বিনিয়োগ করে, আর উভয়ের সম্মতি বা চুক্তির ভিত্তিতে ঋণদাতাকে তার লাভের একটা ‘‘নির্দিষ্ট’’ অংশ দেয়, তাহলে ওই চুক্তিতে উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট। সাধারণ জ্ঞান বা বিবেক অনুসারে এখানে কারো কোনো ক্ষতি নেই। কোনো জুলুম নেই। কেউ প্রতারিত হবার কোনো সুযোগও নেই।

কিন্তু সুদের প্রচলিত সংজ্ঞা বলে, ‘‘লাভজনক’’ কাজে ঋণ দিয়ে কোনো লাভ নিতে চাইলে তা লাভ-লসের উপর ভিত্তি করে নিতে হবে, নির্দিষ্ট (ফিক্স) করে নেয়া যাবে না। ফিক্স করে নিলেই তা সুদ।

এই ফিক্স করে নেয়া না নেয়া নিয়েই আমার কথা।

যেহেতু লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলাম প্রতারণার সুযোগ রাখতে চায় না, বিভিন্ন মাসআলায় যা দেখা যায়, এটা খুব যৌক্তিকও, কিন্তু এই প্রশ্নে এসে ঋণের ওপর লাভ নির্দিষ্ট না করে লাভ-লসের উপর ভিত্তি করে ঋণদাতাকে লাভের ‘‘অনির্দিষ্ট অংশ’’ দেয়ার পক্ষে কথা বলে বিশাল আকারে প্রতারণার সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। মূলত কুরআন বা ইসলাম এটা করেনি, এটা করেছেন ফকীহরা।

ইসলামের আর কোনো মাসআলায় আমি প্রতারণার সুযোগ রাখার বিষয়টা দেখিনি। শুধু এই মাসআলায় এসে লাভ-লসের উপর ভিত্তি করে ঋণদাতাকে লাভের অংশ দেয়ার নিয়মটা করার কারণে অহরহ প্রতারণার শিকার হন ঋণদাতারা।

বাস্তবতা হচ্ছে, এই মাসআলায় প্রতারণার সুযোগ রাখার কারণে বাংলাদেশের কোনো ইসলামী ব্যাংকই এই মাসআলায় আমল করে না। সবাই লাভ নির্দিষ্ট করেই ঋণগ্রহীতাকে ঋণ দিয়ে থাকে বা আমানত প্রদানকারীদেরকে লাভ দিয়ে থাকে। ডিপোজিটের বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকের প্রদত্ত লভ্যাংশকে বাংলাদেশ ব্যাংকের লভ্যাংশের সীমানা অতিক্রম করতে দেখা যায় না সচরাচর।

বাংলাদেশে এটা কল্পণাও করা যায় না, ঋণের টাকায় ব্যবসা করা কোনো মানুষ নিজের ব্যবসায় লাভ ৭০ শতাংশ হলে ঋণদাতাকে অর্ধেক লাভ দিয়ে দেবে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঋণগ্রহীতা ঋণদাতাকে ব্যবসায় লস দেখায় বা যা লাভ হয়েছে, তা অনেক কম পরিমাণে দেখায়। ঋণদাতাকে ঠকানোর চেষ্টা করে।

ফোকাহায়ে কেরামরা যদি এভাবে এই মাসআলায় লাভ-লসের উপর ভিত্তি না করে, ঋণের উপর ঋণদাতা এবং গ্রহীতার সম্মতির উপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট শতাংশ হারে লাভ দেয়ার কথা বলতো, তাহলে কোনো ঋণদাতাই প্রতারিত হতো না। ঋণগ্রহীতা এবং ঋণদাতা উভয় পক্ষই নিজেদের করা চুক্তির উপর সন্তুষ্ট থাকতো।

ঋণ চাইতে গেলে ঋণদাতা বেশি হারে লাভ চাইলে ঋণগ্রহীতা ঋণ নেবে না। আরেকজনের কাছে চাইবে। আর যদি ঋণদাতা সহনীয় হারে লাভ চায়, ঋণগ্রহীতা খুশি মনে ঋণ নেবে। তার লাভ বেশি হলে তা তো আর ঋণদাতাকে দিতে হবে না। আর কোনো মাসে কম লাভ হলে তা ঋণদাতার ঘাড়ে যাবে না। উভয়ে খুশি।

ফোকাহায়ে কেরামের লাভ লসের উপর ভিত্তি করে ঋণ দেয়ার মাসআলার চর্চা করে সমাজে প্রতিনিয়ত অনেক মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। অনেক মানুষ এভাবে ঋণ দেয়ও না শুধুই প্রতারিত হবার ভয়ে। এটা সবার মনে রাখা চাই, ‘‘লাভ লসের উপর ভিত্তি করে ঋণ দিতে হবে’’ এই নিয়মটা কুরআনে উল্লেখ নেই।

কেন প্রতারিত হবার সুযোগ রেখে এই মাসআলা নির্ধারণ করা হয়েছে, কে জানে! ইসলাম যেখানে আর কোনো মাসআলায় প্রতারিত হবার সুযোগ রাখেনি, ফোকাহায়ে কেরাম কেন এখানে রেখেছে?

দুই.

ফিকহ শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘হেদায়া’তে সুদের সংজ্ঞা এইভাবে করা হয়েছে, ‘লেন-দেন করার সময় সেই অতিরিক্ত মালকে সুদ বলা হয়; যা কোনো একপক্ষ শর্ত অনুসারে কোনো বিনিময় ছাড়াই লাভ করে থাকে।’

সুদ হারাম কেন? এই বিষয়ে যুক্তি হচ্ছে, সুদের যে অতিরিক্ত অর্থ আসে তার জন্য মেধা ও শ্রম ব্যয় করতে হয় না। সময় শেষে তা থেকে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা হয়। এতে যে ব্যক্তি ঋণ গ্রহণ করে; ওই ব্যক্তি থেকে অতিরিক্তি অর্থ আদায় করা ‘জুলুম’।

সুদের উদাহরণ দেয়া হয় এভাবে-

আপনার কাছ থেকে কেউ ১০ টাকা ধার নিলো, প্রয়োজন শেষে ওই লোকের কাছ থেকে যদি আপনি ১০ টাকার পরিবর্তে ১১ টাকা গ্রহণ করেন, তাহলে যে বাড়তি ১ টাকা গ্রহণ করেছেন সেটি-ই সুদ। কিন্তু যদি ১০ টাকা ধার দেয়ার পরে ওই লোকের প্রয়োজন শেষে তার সমপরিমাণের চেয়ে বেশি দামে অন্য কোন পণ্য গ্রহণ করেন তাহলে সেটা সুদ হবে না।

১০ টাকার পরিবর্তে ১১ টাকা নিলে যদি সুদ হয়, তাহলে ১০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকার সমপরিমাণের চেয়ে বেশি অন্য জিনিস নেয়া কেন সুদ হবে না?

সুদকে খারাপ বলার পক্ষে যুক্তি হচ্ছে, সুদের যে অতিরিক্ত অর্থ আসে তার জন্য মেধা ও শ্রম ব্যয় করতে হয় না।

কিন্তু যেই লোক ঋণ দেয়, তার টাকাটা সে কি মেধা ও শ্রম ছাড়া উপার্জন করেছে? এখন তার টাকা অন্য একজন লোক ধার নিচ্ছে তার টাকা দিয়ে ব্যবসা করার জন্য। যদি ঋণদাতা ওই লোককে টাকা ধার না দেয়, তাহলে ঋণদাতা নিজে ওই টাকা দিয়ে ব্যবসা করে বা অন্য কোনোভাবে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারবে। বিনা লাভে একজনের কাছে টাকা ফেলে রাখার কী প্রয়োজন?

একজন বেকার লোক ঋণদাতার টাকা খাটিয়ে ব্যবসা করে যদি তাকে কিছুই না দেয়, তাহলে ঋণদাতা ওই লোককে টাকা দিতে চাইবে না। নিজেই ওই টাকা দিয়ে ব্যবসা করবে। অথবা নিজের কাছে ফেলে রাখবে। এতে ঋণ দেয়ার প্রতি মানুষের অনাগ্রহ সৃষ্টি হবে। কেউ কাউকে ঋণ দিতে চাইবে না। সামজে ঋণ দেয়া একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। বেকার লোক বেকার থেকে যাবে। টাকাঅলা আরো টাকার মালিক হবে। সমাজে পুঁজিবাদ আরো জঘণ্য রূপ লাভ করবে। কী লাভ?

‘‘লাভজনক’’ কাজে ঋণ দিয়ে বাড়তি টাকা নেয়াকে সুদ বলার কারণেই সমাজে মানুষ একে অন্যকে ঋণ বা ধার দিতে চায় না এবং এই জন্যই আমাদের দেশে ঋণ প্রদানকারী এনজিও এবং সংস্থার রমরমা ব্যবসা।

আর যদি টাকাঅলার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেকার লোক কর্মসংস্থান করতে পারে আর তার লাভ থেকে ঋণদাতাকে উভয়ের সম্মতিতে কিছু অংশ দেয়, তাহলে উভয় পক্ষই লাভবান হবে। সমাজে ঋণের প্রচলন বাড়বে। নিরীহ ও বেকার মানুষ স্বাবলম্বী হবার সুযোগ পাবে।

টাকা ঋণ দিয়ে বাড়তি টাকা নেয়া তখনই অনুচিত ও জুলুম হবে, যখন কাউকে ‘‘অলাভজনক’’ খাতে খরচ করার জন্য ঋণ দিয়ে বাড়তি টাকা নেয়া হয় এবং এসব খাতে ঋণ দিয়ে শুধু সুদ নয়, বরং চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ নেয়া হয়।

তিন.

আপনি আপনার কোনো ‘‘অলাভজনক’’ কাজে আপনার পরিচিত বা কাছের মানুষ থেকে টাকা ধার চেয়েও পাননি। তখন আপনার প্রয়োজন মেটানোর জন্য বাধ্য হয়ে ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ঋণ নিলেন। আপনি জানেন, এইসব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিলে ওদেরকে বাড়তি টাকা দিতে হয়, তবু এদের কাছ থেকে টাকা ঋণ নেয়া ছাড়া আপনার অন্য উপায় নেই, তাই ওদের শর্ত মেনে টাকা নিলেন। তাহলে এদেরকে বাড়তি টাকা দেয়া কেন আপনার জন্য অন্যায় হবে? আপনি তো অপারগ ছিলেন। তুফানে আপনার ঘর ভেঙ্গে গেছে। আপনি কারো কাছে টাকা ধারও পাচ্ছিলেন না। আপনি কি খোলা আকাশের নিচে জীবন কাটাবেন?

এটা কেন আপনার জন্য সুদ হবে? আপনি তো ‍সুদ হিসেবে কিছুই ভোগ করলেন না। আপনি ওদের কাছ থেকে শুধু মূলধনটাই ভোগ করলেন।

اِنَّمَا حَرَّمَ عَلَیۡکُمُ الۡمَیۡتَۃَ وَ الدَّمَ وَ لَحۡمَ الۡخِنۡزِیۡرِ وَ مَاۤ اُهِلَّ بِهٖ لِغَیۡرِ اللّٰهِ ۚ فَمَنِ اضۡطُرَّ غَیۡرَ بَاغٍ وَّ لَا عَادٍ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۱۷۳﴾

‘‘নিশ্চয় তিনি তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশ্ত এবং যা গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা হয়েছে। সুতরাং যে বাধ্য হবে, অবাধ্য বা সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে, তাহলে তার কোন পাপ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।‘’ সূরাঃ আল-বাকারা, আয়াত নং - ১৭৩

মৃত জন্তু খাওয়াও বৈধ, যখন মানুষ অপারগ হয়। এটাই কুরআনের বিধান।

পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে, ‘কেউ কারও অপরাধের দায় নেবে না।’ (সুরা নাজম : ৩৮)।

আপনার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ব্যাংক আপনার কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিলো। সেই দায় আপনার ঘাড়ে আসবে কেন? কুরআন বলছে আসবে না। কিন্তু ফকীহরা বলছে, আসবে। কোনটা ঠিক?

এই আয়াতগুলো কী বলে? এই আয়াতগুলো থেকে সহজেই বুঝা যায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ‘‘অলাভজনক’’ কাজে বাধ্য হয়ে ঋণ নিয়ে ওদেরকে বাড়তি টাকা পরিশোধ করতে হওয়াটায় কোনো অপরাধ নেই।

তবু কেন যারা এভাবে ঋণ নেয়, তাদেরকে সুদ প্রদানের অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়? ‘‘অলাভজনক’’ কাজে ঋণ নেয়া কেউ কি ব্যাংককে নিজ থেকে সুদ দেয়ার প্রস্তাব দেয়?

চার.

ব্যাংকে ডিপোজিট রেখে সেখান থেকে লাভ নেয়াকেও সুদ বলে আখ্যায়িত করা হয়। মানুষ ব্যাংকে নিজের কষ্টার্জিত টাকা জমা রাখে। ব্যাংক ওই টাকাকে ফেলে না রেখে তা বিনিয়োগ করে বিনিয়োগের লাভ থেকে মানুষকে নির্দিষ্ট হারে লাভ দেয়।

যদি ব্যাংকে জমা রাখা টাকা থেকে মানুষ কোনো সুবিধা গ্রহণ না করে, তাহলে ওই টাকা বিনিয়োগ করে ব্যাংক একাই লাভবান হবে। কিন্তু ওই টাকাটা কি ব্যাংকের? ব্যাংকের নয়। ওটা হচ্ছে মানুষের কষ্টার্জিত টাকা। মানুষের টাকা বিনিয়োগ করে ব্যাংক যেই লাভ করে, তা থেকে মানুষকে একটা অংশ দেয়া তো অবশ্যই ব্যাংকের উচিত।

ফোকাহায়ে কেরাম বলে, এই ক্ষেত্রেও লাভ-লসের উপর ভিত্তি করে ব্যাংক থেকে লাভ-লসের ভাগ নিতে হবে। কিন্তু যদি আপনি ব্যাংককে এই সুযোগ দেন, তাহলে ব্যাংক কি আপনাকে ঠিকঠাকমতো লাভ দেবে? কোনো নিশ্চয়তা আছে? আপনাকে ঠকাবে না? আপনাকে ঠকানোর সুযোগ কি ব্যাংকের হাতে নেই?

ব্যাংককে এই সুযোগ না দিয়ে ব্যাংক থেকে নির্দিষ্ট হারে লাভ নিলে ব্যাংকও খুশি, মানুষও খুশি। প্রতারণাও নেই, কোনো জুলুমও নেই। কিন্তু লাভ লোকসানের কথা বললে ব্যাংক একচেটিয়া লাভ করে যাবে, নিজের পকেট ভরবে, মানুষকে দেবে শুধুই ঠক।

ব্যাংকে টাকা জমা রেখে সেই টাকা থেকে লাভ নেয়াটাকে সুদ বলার কারণে শুধু আমার জানাশোনায় অনেক মানুষ অন্যভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে।

অনেক মানুষ, ব্যাংকে টাকা রাখলে সুদ আসবে, এই ভয়ে কোনো মুদি দোকানে টাকা বিনিয়োগ করেছে। আর মুদি দোকানী দু’এক মাস লাভ দিয়ে পরে গড়িমসি শুরু করেছে। মূল টাকাটা উদ্ধার করতেও পরে কষ্ট হয়েছে। অনেকে ব্রিক ফিল্ডে টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারণার শিকার হয়েছে।

ব্যাংকে টাকা রাখলে সুদ আসবে, এই ভয়ে অনেক মানুষ বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানীতে বিনিয়োগ করে ‘‘হালাল পন্থা’’য় লাভ করতে গিয়ে মোটা অংকের টাকা গচ্ছা দিয়েছে। কেউ তিন লাখ, কেউ দশ লাখ এভাবে। অনেক মানুষ বিভিন্ন সমিতিতে টাকা বিনিয়োগ করে পরে হায় হায় করেছে।

প্রতারিত হওয়ার এই সব ঘটনা ঘটার বড় একটি কারণ হচ্ছে, ব্যাংকে টাকা রেখে সেই টাকার লাভ নেয়াটাকে সুদ বলে অভিহিত করা।

ব্যাংকে টাকা জমা রেখে খুব কম মানুষই শর্ত জুড়ে দেয়, আমাকে এতো শতাংশ হারে লাভ দিতে হবে। ব্যাংক নিজের ইচ্ছামতো লাভ দেয় মানুষকে। মানুষ ওই লাভের উপর খুশি থাকলে ব্যাংকে জমা রাখে, না হয় রাখে না। তাই যারা ব্যাংকের প্রদত্ত লাভের উপর সন্তুষ্ট হয়ে টাকা জমা রাখে, তারাও লাভের ‍উপর খুশি, ব্যাংকও খুশি। কেউ কারো দ্বারা প্রতারিত হবার বা ক্ষতিগ্রস্থ হবার ‍সুযোগ নেই। তবু এটা জুলুম হয় কী করে? জুলুম ছাড়াই সুদ?

বরং ব্যাংকে টাকা জমা রেখে শুধু ব্যাংককে ওই টাকা দিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ দেয়াটা একপক্ষীয় হয়ে যায় এবং এতে মানুষ ব্যাংকের ওপর অসন্তুষ্ট হবেই। কারণ সে দেখে, ব্যাংক তার টাকা দিয়ে লাভবান হচ্ছে, তাকে কিছুই দিচ্ছে না।

পাঁচ.

প্রভিডেন্ট ফান্ডে টাকা জমা রাখার নিয়মটাব্যাংকের মতোই। মানুষ বছরের পর বছর ধরে টাকা জমা রাখে। আর সরকার যদি শুধু ওই টাকা বিনিয়োগ করে লাভ করে যায়, আর যাদের টাকা, তাদেরকে কিছুই না দেয়, তাহলে তা অবশ্যই অন্যায় এবং জুলুম। টাকা জমাদানকারীদেরকে লভ্যাংশ দেয়াটা জুলুম নয়, বরং সুবিচার।

এখানেও মানুষ তাকে কত শতাংশ লাভ দিতে হবে, তার ওপর কোনো শর্ত আরোপ করে না। বরং সরকার স্বেচ্ছায় তাদেরকে একটা লভ্যাংশ দিয়ে থাকে, যার ‍ওপর উভয় পক্ষ সন্তুষ্ট। মানুষ ‍যদি ওই লাভের উপর সন্তুষ্ট না হয়, তাহলে কি প্রভিডেন্ট ফান্ডে টাকা জমা রাখবে? জমাদানকারীদেরকে লাভ দেয়াটা অবশ্যই উচিত এবং নির্দিষ্ট হারে লাভ না দিলে তাদের প্রতারিত হবার সুযোগ থেকে যেতো।

তাই প্রভিডেন্ট ফান্ডে রাখা টাকার উপর প্রদত্ত লাভ গ্রহণ করা অযৌক্তিক এবং অন্যায় কিছু নয়। এবং এটা অবশ্যই ইসলাম সম্মত, কারণ ইসলামে প্রতারিত হবার সুযোগ আছে, এমন কিছু অনুমোদিত নয়।

নূর আহমদ : সরকারি চাকরিজীবি

দাখিল: ১৯৯৮ সাল; প্রথম বিভাগ; টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা।

আলিম: ২০০০ সাল; প্রথম বিভাগ; টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা।

ফাযেল: ২০০২ সাল; প্রথম বিভাগ; টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা।

কামিল: ২০০৪ সাল; প্রথম বিভাগ; নোয়াখালী ইসলামিয়া আলিয়া মাদ্রাসা।

স্নাতক: ২০১৫; প্রথম বিভাগ, নোয়াখালী সরকারি কলেজ।

স্নাতকোত্তর: ২০১৮; CGPA 3.13 out of 4.

Facebook ID

Previous Post